আয়কর রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে TIN, OTP, ব্যাংক তথ্য বা Tax Payment নিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন? এই গাইডে সহজভাবে ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম (e-Return Submit) জানুন।
সংক্ষেপে উত্তর
২০২৬-২৭ করবর্ষের ই রিটার্ন জমা দিতে প্রথমে NBR ওয়েবসাইটে TIN ও NID-নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এরপর আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায় ও কর পরিশোধের তথ্য পূরণ করে Return Review করে Submit করতে হবে। সফলভাবে জমা দেওয়ার পর Acknowledgement Slip, Return Copy ও Tax Certificate ডাউনলোড করা যায়।
ই রিটার্ন কী?
ই রিটার্ন হলো অনলাইনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে আয়কর রিটার্ন প্রস্তুত ও জমা দেওয়ার পদ্ধতি। এতে করদাতাকে সাধারণত কর অফিসে গিয়ে কাগজ জমা দিতে হয় না। ঘরে বসে আয়-ব্যয়ের তথ্য পূরণ, কর পরিশোধ এবং রিটার্নের প্রমাণপত্র সংগ্রহ করা যায়।
২০২৬-২৭ করবর্ষের অনলাইন রিটার্ন সেবা ২২ জুলাই ২০২৬ থেকে চালু হয়েছে। এ করবর্ষে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে নিট প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ প্রণোদনা পাওয়া যাবে, তবে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সেপ্টেম্বরের পর এই সুবিধা থাকবে না। ডিসেম্বরের পর রিটার্ন জমা দিলে অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হতে পারে।
কারা ই রিটার্ন জমা দেবেন?
সাধারণভাবে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন জমা দিতে হবে এবং ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম জানা থাকলে আপনি নিজেই তা দিতে পারেন। তবে কিছু করদাতা নির্দিষ্ট শর্তে কাগজে রিটার্ন দিতে পারেন। যেমন—
-
৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রবীণ করদাতা
-
শারীরিকভাবে অসমর্থ বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি
-
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি করদাতা
-
মৃত করদাতার আইনগত প্রতিনিধি
-
বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিক
-
ই-রিটার্ন সিস্টেমে নিবন্ধনজনিত সমস্যার কারণে অনলাইনে জমা দিতে না পারা ব্যক্তি, যথাযথ অনুমোদন সাপেক্ষে
তবে যোগ্যতা থাকলে এসব ব্যক্তিও চাইলে অনলাইনে রিটার্ন জমা (e-Return Submit) দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম আপনি যদি জেনে রাখেন তাহলে নিজের রিটার্ন নিজেই দিতে পারেন সহজে।
ই রিটার্ন রেজিস্ট্রেশনের জন্য যা লাগবে
রেজিস্ট্রেশনের আগে নিচের তথ্যগুলো প্রস্তুত রাখুন—
|
প্রয়োজনীয় তথ্য |
কেন দরকার |
|---|---|
|
e-TIN নম্বর |
করদাতাকে শনাক্ত করার জন্য |
|
NID-নিবন্ধিত মোবাইল |
OTP যাচাইয়ের জন্য |
|
NID তথ্য |
পরিচয় যাচাইয়ের জন্য |
|
ই-মেইল ও পাসওয়ার্ড |
অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের জন্য |
|
আগের রিটার্নের তথ্য |
পূর্ববর্তী সম্পদ ও করের তথ্য মিলানোর জন্য |
আপনার TIN না থাকলে আগে e-TIN সার্টিফিকেট করার গাইড দেখে নিতে পারেন।
ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম: ধাপে ধাপে
১. অফিসিয়াল পোর্টালে প্রবেশ করুন
প্রথমে অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। নতুন ব্যবহারকারী হলে “I am not registered yet” অপশনে ক্লিক করুন।
২. রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন
TIN নম্বর ও NID-নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর দিন। মোবাইলে OTP এলে সেটি বসিয়ে যাচাই সম্পন্ন করুন। এরপর একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড সেট করুন।
মোবাইল নম্বরটি TIN বা NID-এর সঙ্গে যুক্ত না থাকলে OTP পাওয়ায় সমস্যা হতে পারে।
৩. Return Submission অপশনে যান
লগইন করার পর Dashboard থেকে Return Submission নির্বাচন করুন। সঠিক করবর্ষ ও Assessment Year নির্বাচন করেছেন কি না, তা ভালোভাবে যাচাই করুন।
৪. আয়ের তথ্য পূরণ করুন
প্রযোজ্য আয়ের খাত অনুযায়ী তথ্য দিতে হবে। যেমন—
-
চাকরি বা বেতন
-
বাড়িভাড়া
-
কৃষি আয়
-
ব্যবসায়িক আয়
-
মূলধনী লাভ
-
ব্যাংক সুদ বা অন্যান্য আর্থিক আয়
-
অন্যান্য উৎসের আয়
ব্যাংক সুদ বা DPS, সঞ্চয়পত্র বা ডিভিডেন্ড থেকে উৎসে কর কাটা হলে সেটিও সঠিকভাবে দেখাতে হবে। NBR-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আয়ের তথ্য আগে পূরণ না করলে অনেক ক্ষেত্রে Tax Ledger-এ তথ্য Sync নাও হতে পারে।
৫. বিনিয়োগ, খরচ ও সম্পদের তথ্য দিন
এরপর ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম ফলো করে সঠিকভাবে কর রেয়াতযোগ্য বিনিয়োগ, ব্যক্তিগত খরচ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য পূরণ করুন। যেমন—
-
ব্যাংক ব্যালেন্স
-
জমি বা ফ্ল্যাট
-
গাড়ি
-
সঞ্চয়পত্র বা DPS
-
স্বর্ণালংকার
-
ব্যবসার মূলধন
-
ঋণ ও অন্যান্য দায়
এখানে আগের বছরের সম্পদের সঙ্গে বর্তমান বছরের তথ্যের সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। নতুন কোনো সম্পদ যোগ হলে তার অর্থের উৎসও যুক্তিসংগত হতে হবে।
৬. Tax Payment Status আপডেট করুন
আপনার কর payable হলে অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে কর পরিশোধ করুন। সাধারণত ব্যাংক ট্রান্সফার, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ, নগদ, রকেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে কর পরিশোধের সুবিধা থাকতে পারে।
উৎসে কর বা অগ্রিম কর আগে পরিশোধ করা থাকলে সংশ্লিষ্ট চালান বা সার্টিফিকেটের তথ্য দিন। প্রয়োজনে Challan Amount এবং Claimed Amount আলাদাভাবে পূরণ করতে হতে পারে। ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম ফলো করুন পরিপূর্ণভাবে, তাহলে ভুল হওয়ার সম্ভবনা থাকবে না আশা করা যায়।
৭. Preview করে ভুল সংশোধন করুন
Submit করার আগে পুরো রিটার্ন একবার যাচাই করুন। বিশেষ করে—
-
সব আয়ের তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না
-
বেতন ও TDS সঠিক আছে কি না
-
ব্যাংক সুদ ও উৎসে কর যুক্ত হয়েছে কি না
-
বিনিয়োগের তথ্য সঠিক কি না
-
সম্পদ ও দায়ের হিসাব মিলছে কি না
-
কর পরিশোধের তথ্য সঠিক কি না
-
নাম, ঠিকানা ও কর অঞ্চল ঠিক আছে কি না
৮. Return Submit করুন
সব তথ্য ঠিক থাকলে Declaration সম্পন্ন করে Submit বাটনে ক্লিক করুন। সফলভাবে জমা হলে Acknowledgement Slip, Return Copy ও Tax Certificate ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করুন। অনলাইন রিটার্ন জমা দেওয়ার পর এসব নথি তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়।
ই রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সাধারণ ভুল
কর payable শূন্য হলে রিটার্ন লাগবে না ভাবা
কর দিতে না হলেও অনেকের রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। তাই শুধু কর শূন্য দেখেই রিটার্ন বাদ দেবেন না।
Auto-calculation অন্ধভাবে বিশ্বাস করা
সফটওয়্যার হিসাব করলেও আপনার আয়, বিনিয়োগ ও উৎসে করের তথ্য ভুল হলে রিটার্নও ভুল হতে পারে।
ব্যাংক ও ব্যক্তিগত হিসাব গুলিয়ে ফেলা
ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত লেনদেন একসঙ্গে থাকলে আয় নির্ধারণে সমস্যা হতে পারে। প্রয়োজনে আগে ব্যাংক স্টেটমেন্ট বোঝার গাইড দেখে হিসাব সাজিয়ে নিন।
Draft Save করে Submit না করা
শুধু তথ্য Save করলেই রিটার্ন জমা হয় না। শেষ ধাপে Submit হয়েছে কি না এবং Acknowledgement Slip পাওয়া গেছে কি না নিশ্চিত করুন।
ই রিটার্ন জমা দেওয়ার সুবিধা
-
ঘরে বসে রিটার্ন জমা দেওয়া যায়
-
কর অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন কমে
-
অনলাইনে কর পরিশোধ করা যায়
-
Acknowledgement Slip ডাউনলোড করা যায়
-
Tax Certificate ও Return Copy পাওয়া যায়
-
আগের রিটার্নের রেকর্ড দেখা যায়
-
জমা দেওয়ার প্রমাণ সহজে সংরক্ষণ করা যায়
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
ই রিটার্ন জমা দিতে কি কম্পিউটার লাগবে?
মোবাইল থেকেও কিছু কাজ করা সম্ভব হলেও বড় ফর্ম, হিসাব ও ডকুমেন্ট যাচাইয়ের জন্য ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ ব্যবহার করা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক এবং আপনি নিজেই ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম ফলো করে সব কমপ্লিট করতে পারেন।
TIN-এর মোবাইল নম্বর পরিবর্তন হলে কী করব?
প্রথমে TIN সিস্টেমে মোবাইল নম্বর সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে। এরপর e-Return প্রোফাইলে তথ্য Sync করে আবার OTP যাচাই করুন।
ই রিটার্নে ভুল হলে কি সংশোধন করা যায়?
ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম সঠিকভাবে ফলো করার পরও ভুল হয়ে যেতে পারে সেক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শর্তে অনলাইনে সংশোধিত রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। NBR-এর নির্দেশনা অনুযায়ী সংশোধনের সময়সীমা ও সীমাবদ্ধতা যাচাই করতে হবে।
রিটার্ন জমা দেওয়ার পর কাগজপত্র কোথায় রাখব?
আয়, ব্যাংক, বিনিয়োগ, TDS, সম্পদ ও ঋণের প্রমাণপত্র আলাদা ফোল্ডারে সংরক্ষণ করুন। সাধারণত সব কাগজ আপলোড না করলেও ভবিষ্যৎ যাচাইয়ের জন্য এগুলো রাখা জরুরি।
ব্যবসায়ী হলে BIN ও TIN কি একই?
না। TIN মূলত আয়কর সংক্রান্ত পরিচয়, আর BIN ভ্যাট সংক্রান্ত নিবন্ধন নম্বর। ব্যবসার ধরন অনুযায়ী দুটির প্রয়োজন আলাদা হতে পারে। প্রয়োজনে বাংলাদেশে BIN সার্টিফিকেট করার গাইড পড়ুন।
শেষে যা মনে রাখবেন
ই রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ, দায় ও কর পরিশোধের তথ্য দেওয়া। শেষ তারিখের আগে রিটার্ন Submit করে Acknowledgement Slip সংরক্ষণ করুন। জটিল হিসাব থাকলে অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিন অথবা ই রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম জানা থাকলে আপনি নিজেই তা দিতে পারেন। ।
নিয়মিত কন্টেন্ট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ফললো করতে পারেন- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখার মাঝে যদি কোনো ভাষাগত বা অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে থাকে, অনুগ্রহ করে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে আমাদের আরও ভালো করতে সহায়তা করবে।

স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আমি penciloo.com-এ নিয়মিত প্রযুক্তি ও তথ্যভিত্তিক কনটেন্ট লিখি। মোবাইল, গ্যাজেট এবং ডিজিটাল দুনিয়ার নতুন খবর সহজ ও পরিষ্কার ভাষায় পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমার মূল লক্ষ্য। সঠিক তথ্য ও উপকারী টিপসের মাধ্যমে পাঠকদের দৈনন্দিন কাজে সাহায্য করার চেষ্টা করি।