ই রিটার্ন কী? রেজিস্ট্রেশন ও জমা দেওয়ার গাইড

আয়কর রিটার্ন জমা দিতে গিয়ে অনলাইনে ই রিটার্ন কীভাবে করবেন, কোথায় লগইন করবেন এবং কী কী লাগবে—জানুন সহজ গাইডে।

Table of Contents

সংক্ষেপে উত্তর

ই রিটার্ন (e-Return) হলো অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা। বাংলাদেশে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পোর্টালে TIN ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে রেজিস্ট্রেশন করা যায়। এরপর আয়, বিনিয়োগ, ব্যয়, সম্পদ, দায় ও কর পরিশোধের তথ্য দিয়ে অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়া যায়।

ই রিটার্ন কি?

ই রিটার্ন বা e-Return হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন আয়কর রিটার্ন দাখিল সেবা। আগে করদাতাকে আয়কর অফিসে গিয়ে কাগজে রিটার্ন জমা দিতে হতো। নির্দিষ্ট তথ্য অনলাইনে পূরণ করে ঘরে বসেই এখন রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব।

রিটার্নের মাধ্যমে সাধারণত যেসব কাজ করা যায়:

  • অনলাইনে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া

  • রিটার্নের প্রমাণ হিসেবে Acknowledgement Slip ডাউনলোড

  • Tax Certificate সংগ্রহ

  • TIN Certificate প্রিন্ট বা ডাউনলোড

  • আগের বছরের রিটার্নের তথ্য দেখা

  • কর পরিশোধের চালান সংরক্ষণ

  • রিটার্ন যাচাই বা Return Verify করা

NBR-এর অফিসিয়াল পোর্টালে eTIN, eReturn, Return Verify/PSR এবং eTax Payment-এর মতো সেবা পাওয়া যায়।

ই রিটার্ন কাদের জন্য প্রযোজ্য?

যাদের আয়কর রিটার্ন দাখিলের আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে, তাদের জন্য ই রিটার্ন গুরুত্বপূর্ণ। আয়কর আইন অনুযায়ী সাধারণভাবে নিচের ব্যক্তিদের রিটার্ন দাখিলের প্রয়োজন হতে পারে:

  • করমুক্ত সীমার বেশি আয় থাকলে

  • আগের কোনো বছরে করযোগ্য আয় বা কর নির্ধারণ হয়ে থাকলে

  • ফার্মের অংশীদার হলে

  • কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী হলে

  • সরকারি কর্মচারী হলে

  • ব্যবসা বা পেশায় ব্যবস্থাপনা পদে বেতনভোগী হলে

  • কর অব্যাহতি বা কম হারে করযোগ্য আয় থাকলে

২০২৬–২০২৭ করবর্ষের জন্য ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের ই রিটার্ন সেবা চালু হয়েছে। তবে আপনার ক্ষেত্রে রিটার্ন বাধ্যতামূলক কি না, তা আয়, পেশা, সম্পদ ও প্রযোজ্য নিয়মের ওপর নির্ভর করবে।

ই রিটার্ন রেজিস্ট্রেশনের জন্য কী কী লাগবে?

অনলাইনে ই রিটার্ন রেজিস্ট্রেশন করতে সাধারণত প্রয়োজন হবে:

প্রয়োজনীয় বিষয়

বিস্তারিত

TIN

বৈধ ১২ ডিজিটের আয়কর শনাক্তকরণ নম্বর

মোবাইল নম্বর

NID দিয়ে বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধিত SIM

NID

মোবাইল নম্বর যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজন হতে পারে

ই-মেইল

প্রয়োজনীয় নোটিশ বা যোগাযোগের জন্য

পাসওয়ার্ড

নিজে সেট করতে হবে

আয় ও সম্পদের তথ্য

রিটার্ন পূরণের সময় প্রয়োজন হবে

আপনার মোবাইল নম্বর নিজের নামে নিবন্ধিত কি না, তা যাচাই করতে *16001# ডায়াল করা যায়।

অনলাইনে ই রিটার্ন রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম

১. ই রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন

প্রথমে ই রিটার্ন পোর্টাল-এ প্রবেশ করুন। সেখানে eReturn বা রিটার্ন দাখিলের অপশন নির্বাচন করুন।

২. রেজিস্ট্রেশন অপশনে যান

আপনি আগে রেজিস্ট্রেশন না করে থাকলে Register অথবা I am not registered yet অপশনে ক্লিক করুন।

৩. TIN ও মোবাইল নম্বর দিন

নির্ধারিত ঘরে আপনার TIN এবং NID-ভিত্তিক বায়োমেট্রিকভাবে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর লিখুন। এরপর ক্যাপচা পূরণ করে Verify বাটনে ক্লিক করুন।

৪. OTP যাচাই করুন

আপনার মোবাইলে একটি OTP পাঠানো হবে। নির্ধারিত ঘরে OTP লিখে মোবাইল নম্বর যাচাই করুন।

৫. পাসওয়ার্ড সেট করুন

নতুন একটি শক্তিশালী পাসওয়ার্ড তৈরি করুন। পাসওয়ার্ডে বড় হাতের অক্ষর, ছোট হাতের অক্ষর, সংখ্যা ও বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করা ভালো।

৬. রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করুন

সব তথ্য সঠিক থাকলে রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হবে। এরপর TIN ও পাসওয়ার্ড দিয়ে ই রিটার্ন লগইন করতে পারবেন।

ই রিটার্ন দাখিলের নিয়ম

রেজিস্ট্রেশন শেষ হলে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:

  1. ই রিটার্ন লগইন করুন — TIN ও পাসওয়ার্ড দিয়ে প্রবেশ করুন।

  2. Return Submission নির্বাচন করুন — ড্যাশবোর্ড থেকে রিটার্ন জমা দেওয়ার অপশন খুলুন।

  3. Assessment Information পূরণ করুন — করবর্ষ ও প্রয়োজনীয় করসংক্রান্ত তথ্য দিন।

  4. আয়ের খাত নির্বাচন করুন — চাকরি, ব্যবসা, ভাড়া, বিনিয়োগ বা অন্যান্য আয়ের তথ্য লিখুন।

  5. বিনিয়োগ ও ব্যয়ের তথ্য দিন — প্রযোজ্য বিনিয়োগ, পারিবারিক ব্যয় এবং কর রেয়াতের তথ্য পূরণ করুন।

  6. সম্পদ ও দায় লিখুন — ব্যাংক হিসাব, জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি, সঞ্চয় বা ঋণের তথ্য প্রযোজ্য হলে যুক্ত করুন। প্রয়োজনীয় ব্যাংক তথ্য বুঝতে ব্যাংক স্টেটমেন্ট সম্পর্কে বিস্তারিত গাইড  দেখতে পারেন।

  7. কর পরিশোধের তথ্য দিন — উৎসে কর কর্তন বা চালানের তথ্য যাচাই করে লিখুন।

  8. সব তথ্য যাচাই করুন — ভুল আয়, সম্পদ বা করের তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

  9. Submit করুন — সব ঠিক থাকলে রিটার্ন জমা দিন।

  10. Acknowledgement Slip সংরক্ষণ করুন — জমা দেওয়ার প্রমাণ ডাউনলোড করে রাখুন।

NBR-এর নির্দেশনা অনুযায়ী অনলাইনে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় আয়, বিনিয়োগ, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং কর পরিশোধের তথ্য প্রমাণ দেখে সঠিকভাবে ইনপুট করা উচিত।

ই রিটার্নের পাশাপাশি BIN সম্পর্কে জানতে ভ্যাট রেজিস্ট্রেশন ও BIN সার্টিফিকেট করার সহজ গাইড  দেখে নিতে পারেন।

ই রিটার্ন দাখিলের শেষ তারিখ

সাধারণ ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার জন্য প্রচলিত করদিবস সাধারণত ৩০ নভেম্বর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে করবর্ষ অনুযায়ী NBR সময় বাড়াতে পারে বা বিশেষ শ্রেণির করদাতার জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করতে পারে।

তাই ২০২৬–২০২৭ করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ জানতে NBR-এর সর্বশেষ নোটিশ বা রিটার্ন পোর্টাল যাচাই করুন। পুরোনো বছরের শেষ তারিখ দেখে নতুন করবর্ষের সময়সীমা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

ই রিটার্ন সার্টিফিকেট ও রিটার্ন যাচাইকরণ

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর সাধারণত নিচের ডকুমেন্টগুলো পাওয়া যেতে পারে:

  • Acknowledgement Slip

  • Tax Certificate

  • Return Copy

  • Tax Payment বা চালানের তথ্য

রিটার্নের সত্যতা যাচাই করার জন্য NBR-এর Return Verify/PSR সেবা ব্যবহার করা যায়। কোনো চাকরি, ব্যাংকিং, ঋণ, ভিসা বা সরকারি কাজে রিটার্নের প্রমাণ প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোন ডকুমেন্ট গ্রহণ করবে তা আগে নিশ্চিত করুন।

ই রিটার্ন করতে গিয়ে সাধারণ ভুল

রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় নিচের ভুলগুলো এড়িয়ে চলুন:

  • অন্যের TIN বা মোবাইল নম্বর ব্যবহার করা

  • আয় কম বা বেশি দেখানো

  • ব্যাংক হিসাব ও সম্পদের তথ্য বাদ দেওয়া

  • উৎসে কর কর্তনের তথ্য ভুল লেখা

  • পাসওয়ার্ড অন্যকে দেওয়া

  • OTP বা লগইন তথ্য শেয়ার করা

  • Submit করার আগে তথ্য যাচাই না করা

  • Acknowledgement Slip ডাউনলোড না করা

  • শেষ তারিখের জন্য অপেক্ষা করে সার্ভার সমস্যায় পড়া

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

মোবাইল নম্বর পরিবর্তন হলে রিটার্নে কীভাবে ঢুকব?

TIN খোলার সময় ব্যবহৃত পুরোনো নম্বর না থাকলেও নির্ধারিত নিয়মে মোবাইল নম্বর পরিবর্তন বা পুনরুদ্ধারের অপশন ব্যবহার করা যায়। প্রয়োজন হলে NBR হেল্পলাইনে যোগাযোগ করুন।

রিটার্নের পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে কী করব?

লগইন পেজের Forgot Password বা Reset Password অপশন ব্যবহার করুন। OTP যাচাই করে নতুন পাসওয়ার্ড সেট করার সুযোগ থাকতে পারে।

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর ভুল ধরা পড়লে কী হবে?

ভুলের ধরন অনুযায়ী সংশোধন, সংশোধিত রিটার্ন বা কর অফিসের সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। জমা দেওয়ার পর নিজে থেকে তথ্য পরিবর্তন হয়েছে ধরে নেবেন না।

বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিক কি রিটার্ন দিতে পারবেন?

প্রযোজ্য নিয়ম ও পরিচয় যাচাই সম্পন্ন করতে পারলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি করদাতারাও অনলাইন রিটার্ন দাখিল করতে পারেন। বিশেষ ক্ষেত্রে কাগজে রিটার্নের নিয়ম আলাদা হতে পারে।

আয় না থাকলেও কি রিটার্ন দিতে হয়?

আয় না থাকলেই সবসময় রিটার্নের বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায় না। TIN, পেশা, আগের করযোগ্যতা বা নির্দিষ্ট আইনগত শর্তের কারণে রিটার্ন প্রয়োজন হতে পারে।

শেষে যা মনে রাখবেন

ই রিটার্নের মাধ্যমে ঘরে বসে আয়কর রিটার্ন দাখিল করা যায়। TIN, সঠিক মোবাইল নম্বর, আয়-ব্যয়ের তথ্য এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখুন। সর্বশেষ সময়সীমা ও নিয়ম জানতে NBR-এর অফিসিয়াল পোর্টাল অনুসরণ করুন।

নিয়মিত কন্টেন্ট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ফললো করতে পারেন- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখার মাঝে যদি কোনো ভাষাগত বা অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে থাকে, অনুগ্রহ করে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে আমাদের আরও ভালো করতে সহায়তা করবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Comment

error: Content is protected !!