কুরবানির শরিকদের নাম বলার হুকুম কী? জবাইয়ের আগে জানুন ইসলামের সঠিক বিধান

কুরবানির শরিকদের নাম বলার হুকুম কী? কুরবানির আগে শরিকদের নাম বলা কি জরুরি? পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, আনুগত্য ও আত্মশুদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। প্রতি বছর কুরবানির সময় মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পশু কুরবানি করেন। তবে কুরবানিকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু ভুল ধারণা ও অপ্রয়োজনীয় রেওয়াজও প্রচলিত রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো কুরবানির পশু জবাইয়ের আগে শরিকদের নাম একে একে উচ্চারণ করা। অনেকেই মনে করেন, নাম না বললে কুরবানি শুদ্ধ হবে না। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি কতটুকু সঠিক, তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই প্রশ্ন রয়েছে।

ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকেই কুরবানি বলা হয়। মহান আল্লাহর আদেশ পালন করতে গিয়ে হজরত ইবরাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে কুরবানি করার যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, সেই স্মৃতিকে জীবন্ত রাখতেই মুসলিমরা প্রতি বছর কুরবানি আদায় করে থাকেন।

আরও পড়ুন- কোন কোন পশু কোরবানি দেওয়া যায় না? কুরবানির সঠিক নিয়ম ও গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা

বিশেষ করে গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে একাধিক ব্যক্তি শরিক হয়ে কুরবানি করতে পারেন। ইসলামী বিধান অনুযায়ী, একটি গরু বা মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবেন। তবে প্রত্যেকের অংশ কমপক্ষে এক সপ্তমাংশ হতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক শরিকের নিয়ত বিশুদ্ধ হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কুরবানির শরিকদের নাম বলার হুকুম কী? এ সম্পর্কে অনেকেই ভালোভাবে জানেন না এবং অনেক এলাকায় দেখা যায়, পশু জবাইয়ের আগে দীর্ঘ সময় ধরে শরিকদের নাম, বাবার নাম কিংবা এলাকার নাম পর্যন্ত উচ্চারণ করা হয়। এতে অনেক সময় জবাইয়ে দেরি হয় এবং পশুকে অতিরিক্ত কষ্ট পেতে হয়। অথচ ইসলামে পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শনের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন, কুরবানির আগে শরিকদের নাম বলা বাধ্যতামূলক নয়।

আলেমদের মতে, কুরবানির মূল বিষয় হলো নিয়ত। অর্থাৎ যারা কুরবানি দিচ্ছেন, তারা মনে মনে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানি করার ইচ্ছা পোষণ করলেই তা যথেষ্ট। আলাদা করে মুখে নাম উচ্চারণ করা ফরজ বা ওয়াজিব কোনো বিষয় নয়। জবাইকারী যদি জানেন যে তিনি কার পক্ষ থেকে কুরবানি করছেন, তাহলে সেই কুরবানি সহিহ হয়ে যাবে। কুরবানির শরিকদের নাম বলার হুকুম কী বা অন্য কিছু নিয়ে বিস্তারিত চিন্তা না করে আমাদের মন পরিষ্কার করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে-ই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত।

বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা দেখা যায়। কেউ কেউ মনে করেন, নাম না বললে শরিকদের কুরবানি গ্রহণ হবে না। আবার অনেকে এটিকে ধর্মীয় নিয়ম হিসেবেই প্রচার করেন। কিন্তু ইসলামি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ধারণার বেশিরভাগই লোকমুখে প্রচলিত, শরিয়তের মৌলিক বিধানের সঙ্গে যার সরাসরি সম্পর্ক নেই।

কুরবানির সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পশুকে দ্রুত ও কম কষ্ট দিয়ে জবাই করা। এটা না যে  কুরবানির শরিকদের নাম বলার হুকুম কী এসব নিয়ে ভাবা বরং হাদিসে প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই পশুকে দীর্ঘ সময় শুইয়ে রেখে তালিকা পড়া বা বিলম্ব করা ইসলামের সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং দ্রুত জবাই সম্পন্ন করাই উত্তম।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বর্তমানে অনেক মানুষ না জেনে বিভিন্ন ভুল নিয়ম অনুসরণ করেন। কেউ মনে করেন, নির্দিষ্ট দোয়া না পড়লে কুরবানি হবে না। আবার কেউ অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতাকেই বেশি গুরুত্ব দেন। অথচ ইসলামে সহজ ও বিশুদ্ধভাবে ইবাদত পালনকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কুরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা। কেউ যদি লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদার জন্য কুরবানি করেন, তাহলে সেই ইবাদতের প্রকৃত উদ্দেশ্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই আল্লাহর সন্তুষ্টিই হওয়া উচিত কুরবানির মূল লক্ষ্য।

ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, কুরবানিকে কেন্দ্র করে সমাজে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। কারণ ভুল তথ্য বা কুসংস্কারের কারণে মানুষ অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে ধর্মীয় বিধান মনে করে বসেন। এজন্য কুরবানি সম্পর্কিত সঠিক মাসআলা জানা জরুরি।

বর্তমানে অনলাইনে ও সামাজিক মাধ্যমে কুরবানি সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজেন মানুষ। তবে সব তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়। তাই ইসলামি বিষয়ে নিশ্চিত হতে অভিজ্ঞ আলেম বা নির্ভরযোগ্য ফতোয়া অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবমিলিয়ে, কুরবানির পশু জবাইয়ের আগে শরিকদের নাম বলা ইসলামে বাধ্যতামূলক কোনো বিধান নয়। মূল বিষয় হলো নিয়ত ও সঠিকভাবে কুরবানি আদায় করা। অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব না করে দ্রুত ও মানবিক উপায়ে পশু জবাই করাই ইসলামের শিক্ষা। তাই কুরবানির সময় ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় প্রথা পরিহার করাই হবে একজন সচেতন মুসলিমের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন- ঈদুল আজহা উপলক্ষে ৭ দিনের ছুটি ঘোষণা: সরকারি সিদ্ধান্ত ও বিস্তারিত

👉নিয়মিত কন্টেন্ট পেতে আমাদের ফেসবুক পেজ ফললো করতে পারেন- ফেসবুক পেজে যুক্ত থাকুন!

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখার মাঝে যদি কোনো ভাষাগত বা অনিচ্ছাকৃত ভুল থেকে থাকে, অনুগ্রহ করে তা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনার মূল্যবান মতামত ও পরামর্শ আমাদের জন্য  অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতে আমাদের আরও ভালো করতে সহায়তা করবে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Comment