আজ ০৭ জানুয়ারি ২০২৬, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, মানসম্মত ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এর স্থলে গঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন। প্রস্তাবিত এই কমিশন আগের কাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন ইউজিসির জায়গায় নতুন কমিশন?
১৯৭২–এর দশকে যাত্রা শুরু করা ইউজিসি মূলত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট অনুমোদন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ প্রদানের কাজেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত কয়েক দশকে দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর পরিমাণ ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই কাঠামো অনেকটাই অকার্যকর হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত আইনগত ক্ষমতা না থাকায় ইউজিসি অনেক ক্ষেত্রেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরেই একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল।
খসড়া অধ্যাদেশ ও সরকারের উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকার ইতোমধ্যে উচ্চশিক্ষা কমিশন অধ্যাদেশ–২০২৫ এর খসড়া প্রস্তুত করেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই খসড়াটি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের জন্য পাঠিয়েছে এবং মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করেছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত মতামত বিশ্লেষণ করে পরবর্তী চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই খসড়ার কাঠামো প্রণয়নে ইউজিসিরও ভূমিকা রয়েছে।
কমিশনের কাঠামো ও নেতৃত্ব
প্রস্তাবিত উচ্চশিক্ষা কমিশনের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকায়। প্রয়োজনে বিভাগীয় বা আঞ্চলিক অফিস স্থাপনের সুযোগ থাকবে, যা আগে ইউজিসির ক্ষেত্রে ছিল না।
এই কমিশনে থাকবেন—
-
১ জন চেয়ারম্যান
-
৮ জন পূর্ণকালীন কমিশনার
-
১০ জন খণ্ডকালীন সদস্য
চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হবে একটি সার্চ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে। তাঁদের মেয়াদ হবে চার বছর, প্রয়োজনে পুনর্নিয়োগের সুযোগও থাকবে।
চেয়ারম্যান ও কমিশনার হওয়ার যোগ্যতা
চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেতে হলে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন শিক্ষাবিদ হতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন—
-
স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে পিএইচডি ডিগ্রি
-
কমপক্ষে ২৫ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতা
-
অন্তত ১৫ বছর অধ্যাপক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা
-
উল্লেখযোগ্য গবেষণা প্রকাশনা ও প্রশাসনিক দক্ষতা
চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা হবে একজন পূর্ণ কেবিনেট মন্ত্রীর সমতুল্য (যদিও তিনি মন্ত্রী হবেন না)। কমিশনারদের মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির সমপর্যায়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং ও মাননিয়ন্ত্রণ
নতুন কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে প্রতি তিন বছর অন্তর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র্যাঙ্কিং প্রকাশ। নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই র্যাঙ্কিং করা হবে।
যেসব বিশ্ববিদ্যালয় পিছিয়ে পড়বে, তাদের জন্য বিশেষ তদারকি ও উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এর ফলে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে এবং শিক্ষার মান বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
কমিশনের প্রধান দায়িত্বসমূহ
প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা কমিশন যেসব কাজ করবে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
-
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার চাহিদা নিরূপণ
-
শিক্ষার মানোন্নয়নে নীতিমালা প্রণয়ন
-
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট তদারকি
-
দেশি ও বিদেশি গবেষণা প্রকল্প পর্যবেক্ষণ
-
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ
-
পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণে সহায়তা
-
ক্রেডিট ট্রান্সফার ও এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম চালুতে সহযোগিতা
অনিয়মে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা
কমিশন প্রয়োজনে যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শন, হিসাব যাচাই এবং তদন্ত করতে পারবে। অনিয়ম বা দুর্নীতির প্রমাণ পেলে—
-
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ স্থগিত
-
কোর্স বা প্রোগ্রামের অনুমোদন বাতিল
-
নতুন ভর্তি বন্ধ করার মতো সিদ্ধান্তও নিতে পারবে
তবে এসব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল ও রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পাবে।
বার্ষিক প্রতিবেদন ও জবাবদিহি
প্রতি বছর কমিশনকে আগের অর্থবছরের কার্যক্রম নিয়ে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিতে হবে। এই প্রতিবেদন জাতীয় সংসদেও উপস্থাপন করা হবে, যা কমিশনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করবে।
শিক্ষাবিদদের দৃষ্টিতে নতুন কমিশন
অনেক শিক্ষাবিদ মনে করছেন, এই উদ্যোগ সময়োপযোগী। তাঁদের মতে, উচ্চশিক্ষার বিস্তার যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, নতুন কমিশন যদি পর্যাপ্ত স্বাধীনতা, দক্ষ জনবল ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে দেশের উচ্চশিক্ষার মানে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি সম্ভাবনাময় অধ্যায় হতে পারে। তবে এই কমিশন কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের গুণগত মান, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সর্বোপরি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এটি নিঃসন্দেহে দেশের উচ্চশিক্ষাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।